বেশি মানুষ উঠলেই দুলতে থাকে কাঠের পুল

নইন আবু নাঈম তালুকদার শরণখোলা থেকেঃ

Date: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬
news-banner
এক সঙ্গে বেশি মানুষ উঠলেই দুলতে থাকে কাঠের পুলটি। নড়বড়ে অবকাঠামো। চাপ বাড়লে ভেঙে পড়তে পারে যে কোনো সময়। সেই আশঙ্কায় তখন দুই পারে অপেক্ষা করতে হয় শত শত মানুষকে। নতুন সেতু নর্মিাণ না হওয়ায় পাঁচ বছর ধরে এভাবেই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা সদরের রায়েন্দা ও খোন্তাকাটা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের।
সুন্দরবন লাগোয়া শরণখোলা উপজেলাটির প্রধান শহর রায়েন্দা বাজার। এই শহরের পাশ থেকে বয়ে চলা রায়েন্দা খালের ওপর এসময় আরসিসি সেতু ছিল। পুরনো সেই সেতুটি ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট সকালে হঠাৎ খালে ধসে পড়ে সৃষ্টি হয় চরম জনদুর্ভোগ। এর পর মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কিছুটা দূরেই দুই ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয় অস্থায়ী কাঠের পুলটি। সময়ের ব্যবধানে সেই কাঠের পুলটিও এখন হয়ে পড়েছে নড়বড়ে। সেই নড়বড়ে পুল দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করছে শিক্ষার্থীসহ হাজার হাজার মানুষ। কবে হবে সেতু এমন প্রশ্ন এবং শঙ্কা এখন সবার। 
উপজেলা প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, পুরনো সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর সেই স্থানে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে গ্রামীণ সহায়তা সেতু প্রকল্পের আওতায় ৭৪ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১১ কোটি টাকা। এর পরে মাটি পরীক্ষা, নকশা প্রনয়নসহ প্রয়োজনীয় সকল প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল সেতু নির্মাণের কাজ। কিন্তু এরই মধ্যে সরকার পরিবর্তন হওয়ায় স্থগিত হয়ে যায় সকল কার্যক্রম। পরবর্ততে আর আলোর মুখ দেখেনি রায়েন্দা খালের এই সেতু প্রকল্পটি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল কাঠের পুলটি খুবই ঝঁকিপূর্ণ। নোনায় ক্ষয় হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে রেলপাটির অবকাঠামোগুলো। একসঙ্গে বেশি মানুষ উঠলে দুলতে থাকে দোলনার মতো। এটিও ধসে পড়তে পারে যেকোনো সময়। এমন আশঙ্কায় পুলের মাঝ বরাবর দুই পাশে পুঁতে রাখা হয় নারকেল গাছ। রোদ-বৃষ্টিতে পচন ধরে ভেঙে গেছে সেই নারকেল গাছও। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পুল পার হয়ে চলাচল করছে মানুষ। 
খালের দক্ষিণ পাড়ে উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্র রায়েন্দা বাজার। এই বাজাটিতে রয়েছে দুই সহস্রাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া এই পাড়ে রয়েছে সরকারি হাসপাতাল, থানা, পোস্ট অফিস, সরকারি-বেসরকারি ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঁচটি ব্যাংকসহ অসংখ্য বাণিজ্যিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। অপরদিকে খালের উত্তর পাড়ে রয়েছে শরণখোলা সরকারি ডিগ্রি কলেজ, একটি ফাজিল মাদরাসা, তিনটি বরফ কল, একটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রসহ দুই শতাধিক দোকানপাট। দুর্বল এই কাঠের পুলটিই এখন দুই ইউনিয়নের এসকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীসহ হাজার হাজার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলের ওপর উঠলেই কাঁপতে থাকে। বেশি লোকজন দেখলে একপাড়ে দাঁড়িয়ে অপক্ষো করতে হয় শিক্ষার্থীদের। বর্ষা মৌসুমে আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে পুলটি। কাদা-পানিতে কাঠের পাটাতন পিচ্ছিল হয়ে হাটার উপায় থাকে না। সব সময় একটা আতঙ্ক নিয়ে পুল পার হতে হয়। এখানে দ্রুত একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
রায়েন্দা বাজারের ব্যবসায়ী শহিদল ইসলাম, সরোয়ার হোসেন, খোকন শিকদারসহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, কাঠের পুলটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ভারী মালামাল নিয়ে পুল পার হওয়া যায় না। আরো একবছর আগে শুনেছি এখানে পাকা ব্রিজ হবে। ব্রিজ হবে হবে করে পাঁচ বছর পার হতে চলেছে। কিন্তু তার কোনো আলামত দেখছি না আজও। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন ও নিরাপদ চলাচলের জন্য রায়েন্দা খালের ওপর জরুরিভাবে পাকা ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানাই সরকারের কাছে। 
শরণখোলার রায়েন্দা-রাজৈর ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ আব্দুল জলিল আনোয়ারী ও রায়েন্দা সরকারি পাইলট হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল হালিম বললেন, কাঠের পুলের অবস্থা খুবই নাজুক। প্রতিদিন কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে এই পুল দিয়ে। এখানে পাকা সেতু নির্মাণ না হলে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যেকোনো সময়। 
জেলার শরণখোলা উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. আরিফুল ইসলামের ভাষ্য, তৎকালিন কিছু জটিলতার কারণে সেতু প্রকল্পটি বাস্তাবায়ন সম্ভব হয়নি। একপর্যায় বাতিল হয়ে যায় প্রকল্পটি। বিষয়টি তখন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবিহিত করা হয়েছিল। সম্প্রতি আবারও এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত বিকল্প কিছুই করা সম্ভব নয়।

Leave Your Comments