আজ খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমান। তার এই সফরকে কেন্দ্র করে সমগ্র দাকোপ অঞ্চলজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ ও চরম উদ্দীপনা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন এবং নানা অবহেলার শিকার এই অবহেলিত উপকূলীয় মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভাব-অভিযোগ ও প্রত্যাশার ঝুলি এখন তাদের প্রিয় নেতার কাছে তুলে ধরার প্রতীক্ষায়।দাকোপের সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর প্রধান প্রধান চাওয়া-পাওয়া ও দাবিগুলো উঠে এসেছে। জননেতা তারেক রহমানের এই ঐতিহাসিক সফরে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ যে প্রধান ১০টি মৌলিক দাবি বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো:উপকূলীয় মানুষের ১০ দফা প্রধান দাবি ও প্রত্যাশা১. টেকসই নদী শাসন ও টেকসই বেড়িবাঁধ (ভাঙন রোধ) দাকোপের মানুষের সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো নদীভাঙন। পশুর ও ঢাকি নদীর গ্রাস থেকে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি রক্ষায় জিওব্যাগ বা সাময়িক ব্যবস্থা নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থায়ী নদী শাসন ও টেকসই উঁচু বেড়িবাঁধ নির্মাণের জোরালো দাবি সাধারণ মানুষের।২. টেকসই রাস্তা নির্মাণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নউপকূলের অধিকাংশ কাঁচা ও অর্ধ-পাকা রাস্তা বর্ষা মৌসুমে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে টেকসই ও মানসম্মত প্রধান ও উপ-সড়ক নির্মাণের আকুল আবেদন জানানো হচ্ছে।৩. সুপেয় বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী সমাধান দাকোপে সুপেয় পানির সংকট অত্যন্ত তীব্র। পানির লবণাক্ততা দূর করে সমগ্র উপজেলায় নিরাপদ ও সুপেয় বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিতকরণে বৃহৎ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও সুনির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্পের দাবি দীর্ঘদিনের।৪. সুতারখালী ইউনিয়নে মাধ্যমিক/উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার কেন্দ্র স্থাপনসুতারখালী ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হয়, যা বর্ষা বা দুর্যোগের দিনে অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন ও দুর্ভোগ কমাতে সুতারখালী ইউনিয়নে একটি পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি সর্বস্তরের।৫. একটি নতুন সরকারি/মানসম্মত কলেজ স্থাপনউচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের দাকোপের বুকেই পড়ার সুযোগ তৈরি করতে নতুন একটি সুসজ্জিত কলেজ স্থাপনের জোর দাবি উঠেছে।৬. নলিয়ানে একটি ২০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণস্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। দাকোপের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বর্তমান প্রাথমিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো অপ্রতুল। জরুরি চিকিৎসা সুবিধা, পর্যাপ্ত ডাক্তার ও আধুনিক সরঞ্জামসহ নলিয়ানে একটি ২০ শয্যার মানসম্মত হাসপাতাল চান এলাকাবাসী।৭. পর্যটন শিল্পের প্রসার ও আধুনিক পর্যটন কেন্দ্রসুন্দরবনের কোলঘেঁষে অবস্থিত দাকোপে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনৈতিক চাকা সচল করতে ও স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াতে এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের বা পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।৮. সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখা উপকূলের জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালদের জীবিকা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত রেখে সাধারণ পেশাজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হচ্ছে।৯. দাকোপে এলএনজি (LNG) টার্মিনাল নির্মাণ
অঞ্চলের শিল্পায়ন, শক্তি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চান এ অঞ্চলের অর্থনীতি সচেতন মানুষেরা।১০. দুটি বহুল প্রতীক্ষিত সেতু নির্মাণ দাকোপের যোগাযোগ বিপ্লবে দুই প্রধান বাঁধা হলো নদী। 'পানখালী টু বরনপাড়া' এবং 'পোদ্দারগঞ্জ টু চুনকুড়ি'—এই দুটি সেতুর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান দেখতে চায় সমগ্র দাকোপবাসী। সেতু দুটি নির্মিত হলে খুলনার মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।দাকোপবাসীর আকুতি:
"আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা বাঁচবার মতো স্থায়ী সমাধান চাই। জননেতা তারেক রহমান আমাদের এই প্রাণের দাবিগুলো পূরণ করে দাকোপকে একটি আধুনিক, দুর্যোগ-সহনশীল ও সমৃদ্ধ জনপদে রূপান্তর করবেন—আজকের দিনে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।"দাকোপের সাধারণ মানুষ আশাবাদী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে উপকূলীয় জীবনযাত্রায় এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
নির্ধারিত সরকারি সফরসুচিঅনুযায়ীখুলনারদাকোপেপৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকাল দশটা২৯ মিনিটে তাকে বহনকারী বিশেষ বিশেষ হেলিকপ্টারটি উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করে।এর আগে সকাল আটটার নিজ বাসভবন থেকে তেজগাঁও বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৯ টায় তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে থেকে হেলিকপ্টারে করে সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন তিনি।আকাশ পথ থেকে পয়েন্ট ও সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার কথা রয়েছে তার। নলিয়ান মাঠে পৌঁছানোর পর সেখান থেকে সড়কপথে লঞ্চঘাটে যান এবং জলপথেবাগেরহাটের বানৌজা মোংলার উদ্দেশে রওনা হন। মোংলায় পৌঁছে দুপুরের মধ্যাহ্নবিরতি ও নির্ধারিত সভায় অংশ নেন তিনি। এই বৈঠকে খুলনার বিভাগীয় কমিশনার এবং খুলনা ও বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের উপস্থিত রয়েছেন।সভা শেষে দুপুর পৌনে তিনটার দিকে মোংলা বন্দরের জেটি পরিদর্শনে যান প্রধানমন্ত্রী। এরপর বেলা সোয়া তিনটায় তার প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনের করেন।। দিনব্যাপী সরকারি ব্যস্ততা শেষে বিকেল চারটায় মোংলা হেলিপ্যাড থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে বিকেল পাঁচটায় রাজধানীতে এসে পৌঁছান তিনি।প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সরকারি সফর হওয়ায় রাজনৈতিক কোনো জনসভা বা দলীয় নেতাকর্মীদের সমাগমের কর্মসূচি রাখা হয়নি। সফরকে কেন্দ্র করে খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও পিজিআরের সমন্বয়ে চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।