বালু খেকোদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ, সাংবাদিকের বাড়িতে হামলা ও মিথ্যা মামলা

গঙ্গাচড়া ( রংপুর) প্রতিনিধিঃ

Date: শুক্রবার, এপ্রিল ০৩, ২০২৬
news-banner
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিকের বাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছে। এতে তার পরিবারের তিন সদস্য আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে পরে ওই সাংবাদিক ও তার পরিবারের নামেও পাল্টা মিথ্যা মামলা দায়ের হওয়ায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগী মো. রিয়াদুন্নবী রিয়াদ, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রতিনিধি। তার দায়ের করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে একদল সশস্ত্র বাহিনী তার বাড়িতে হামলা চালায়। এতে তার বাবা ইলিয়াছ আলী, মা মোসলেমা বেগম (৪৭) এবং ফুফু কোকিলা বেগম (৪৫) আহত হন। গুরুতর আহত কোকিলা বেগমকে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
সাংবাদিক রিয়াদুন্নবী রিয়াদ অভিযোগ করেন, তিস্তা নদী এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে গত ১৯ জানুয়ারিতে "গঙ্গাচড়ার তিস্তা নদীতে বালু উত্তোলন, হুমকিতে বাঁধ" শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই একটি প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ী চক্র তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এরই জেরে পরিকল্পিতভাবে তার বাড়িতে হামলা চালানো হয়। তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন এবং হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। হঠাৎ তার বাবার ফোন পেয়ে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর সহকর্মীদের নিয়ে দ্রুত গঙ্গাচড়া মডেল থানায় যান। তবে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ইনচার্জকে তাৎক্ষণিকভাবে না পেয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কিন্তু সংযোগ সম্ভব হয়নি। পরে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দেন। ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক বেনজুম আলী বেনজির বলেন, যখন তার বাড়িতে হামলা হয়, তখন আমরা সবাই প্রেসক্লাবে অবস্থান করছিলাম। বিষয়টি জানতে পেরে আমরা একসঙ্গে গঙ্গাচড়া মডেল থানায় যাই। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ইনচার্জকে তাৎক্ষণিকভাবে না পেয়ে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সংযোগ সম্ভব হয়নি। পরে আমরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দিলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি আরও বলেন, হামলার সময় সাংবাদিক রিয়াদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। এটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত হামলা এবং তাকে ফাঁসানোর অপচেষ্টা বলে আমরা মনে করি।

গ্রামবাসী সোহেল রানা বলেন, হামলার সময় সাংবাদিক রিয়াদ ঘটনাস্থলে ছিলেন না,এটা আমরা নিজের চোখে দেখেছি। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা এলাকার চিহ্নিত বালু খেকো, তারা ভয় দেখিয়ে সত্য চাপা দিতে চায়। গ্রামবাসী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এটা কোনো সাধারণ ঘটনা না, পরিকল্পিত হামলা। একজন সাংবাদিক অবৈধ বালুর বিরুদ্ধে লেখালেখি করায় তার বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। এখন আবার তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে এটা সম্পূর্ণ অন্যায় ও নিন্দনীয়।
জান্নাতী বেগম বলেন, আমরা নিজের চোখে দেখেছি, হামলার সময় রিয়াদ এখানে ছিলেন না। বালু ব্যবসায়ীরা এসে সাংবাদিকদের বাড়িতে হামলা করলো ও মারধর করলো তারাই আবার সাংবাদিকে নামে মিথ্যা মামলা করলো । আমরা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাই দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হোক।
এ ঘটনায় তিনি তাজু মিয়া, রাজু মিয়া, আজিবর রহমান, রিপন মিয়া, আলেফ উদ্দিন ও তাজমিনা বেগমসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
অন্যদিকে, ঘটনার দুইদিন পর ২০ মার্চ সাংবাদিক এর দায়ের করা মামলার আসামি তাজমিনা বেগম সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। তার অভিযোগ, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ১৮ মার্চ রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রতিপক্ষ তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে তিনি ও তার ছেলে আহত হন এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ওই মামলায় সাংবাদিক রিয়াদুন্নবী রিয়াদসহ ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সাংবাদিক রিয়াদুন্নবী রিয়াদ বলেন, আমার সঙ্গে অভিযুক্তদের কোনো জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নেই এ বিষয়টি স্থানীয় সবাই অবগত। ঘটনার সময় আমি থানায় ছিলাম এবং আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। গঙ্গাচড়া মডেল থানার ১৮ মার্চ রাতের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলেই বিষয়টি প্রমাণ হবে। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমাকে হয়রানি করতে পরিকল্পিতভাবে এই মিথ্যা মামলা দিয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিক নেতারাও ঘটনাটিকে নিন্দনীয় উল্লেখ করে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ ও থানা সূত্রে জানা গেছে, এর আগে অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এর ১৫(১) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১৮৬/১৪৯ ধারায় গঙ্গাচড়া মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দিলে আসামিরা পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশকে লাঞ্ছিত করে। পরবর্তীতে গ্রেফতারের সময়ও তাদের সঙ্গে পুলিশের পুনরায় সংঘর্ষ হয়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং তারা গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। এ ঘটনায় মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন,রাজু আহম্মেদ (২৮), পিতা: মোঃ আলেফ উদ্দিন; মোঃ আজিবর রহমান (২৬), পিতা: মোঃ আলেফ উদ্দিন; মোঃ রিপন মিয়া (২৪), পিতা: মোঃ আলেফ উদ্দিন; মোঃ আলেফ উদ্দিন (৬০), পিতা: মৃত সলিম উদ্দিন। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। একই ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট এসআই বাদী হয়ে পৃথক একটি মামলাও দায়ের করেন বলে জানা গেছে।ওই মামলার আসামিরাই পরবর্তীতে সংঘবদ্ধ হয়ে সাংবাদিকের বাড়িতে হামলা চালায়।

এ বিষয়ে গঙ্গাচড়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুর ছবুর জানান, উভয় পক্ষের মামলা গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও তিনি জানান।

Leave Your Comments