বিশ্বকাপ থেকে বিদায়, জাতীয় দলকেও বিদায়: চোখের জলে ব্রাজিলের জার্সি খুলে রাখলেন নেইমার

স্বপন কুমার রায় খুলনা ব্যুরো প্রধানঃ

Date: সোমবার, জুলাই ০৬, ২০২৬
news-banner
ব্রাজিলের ফুটবলের একটি স্বর্ণালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল বিশ্বকাপের মঞ্চেই। নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান ব্রাজিল অধিনায়ক Neymar। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখানেই শেষ। আমার যাত্রা শেষ হয়ে গেল।” এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ম্যাচটি ছিল নাটকীয়। নির্ধারিত সময়ের শেষদিকে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে চমকে দেন Erling Haaland। যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও নেইমারের সেই গোল কেবল ব্যবধানই কমায়। শেষ বাঁশি বাজতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রাজিল তারকা। সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও স্পষ্ট ছিল—এটি শুধু একটি ম্যাচের পরাজয় নয়, একটি যুগের অবসান।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে ২০১০ সালে ব্রাজিলের হয়ে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। কাকতালীয়ভাবে যে স্টেডিয়ামে তাঁর আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই একই মাঠে শেষও হল তাঁর জাতীয় দলের অধ্যায়। বিদায়বেলায় তিনি বলেন, “যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানেই শেষ করলাম।” এই প্রতীকী সমাপ্তি তাঁর আবেগকে আরও গভীর করে তুলেছে।
জাতীয় দলের জার্সিতে নেইমারের পরিসংখ্যান ঈর্ষণীয়। তিনি ব্রাজিলের হয়ে ১২৯টির বেশি ম্যাচে ৮০টি গোল করে দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে অবসর নিলেন। শুধু গোলই নয়, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিল আক্রমণের প্রধান ভরসা ছিলেন তিনি। চারটি বিশ্বকাপে খেলেছেন, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলকে জয় এনে দিয়েছেন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছেন।
তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হয়ে থাকবে বিশ্বকাপ। ২০১৪ সালে চোট তাঁকে সেমিফাইনাল থেকে ছিটকে দেয়। ২০১৮ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়, ২০২২ সালে টাইব্রেকারে হৃদয়ভাঙা হার এবং ২০২৬ সালে শেষ ষোলোতেই ছিটকে যাওয়া—প্রতিবারই বিশ্বকাপের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। ব্যক্তিগত সাফল্যের শিখরে উঠলেও ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি তাঁর হাতে আর ওঠেনি।
তবু নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে ব্যর্থ বলা যাবে না। ২০১৩ সালে তিনি ব্রাজিলকে জিতিয়েছেন কনফেডারেশনস কাপ। ২০১৬ সালে দেশের মাটিতে অলিম্পিকের ফুটবলে এনে দিয়েছেন ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক। অসাধারণ ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা, গোল করার দক্ষতা এবং দর্শক মাতানো ফুটবল তাঁকে ব্রাজিলের কিংবদন্তিদের সারিতে স্থায়ী আসন দিয়েছে।
এই বিশ্বকাপেও নেইমারের পথ সহজ ছিল না। চোটের কারণে তিনি টুর্নামেন্টের শুরুতে ছন্দে ছিলেন না। ধীরে ধীরে দলে ফিরলেও পুরোপুরি ফিট হতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত নরওয়ের বিরুদ্ধে বদলি হিসেবে নেমে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক গোলটি করলেন, কিন্তু সেটি ব্রাজিলকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।
নেইমারের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিলের ফুটবলও নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করল। আগামী বিশ্বকাপের আগে দলকে নতুন নেতৃত্ব, নতুন আক্রমণভাগ এবং নতুন স্বপ্ন গড়ে তুলতে হবে। কারণ গত দেড় দশক ধরে ব্রাজিল মানেই ছিলেন নেইমার—মাঠে তাঁর উপস্থিতি যেমন প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাত, তেমনই সমর্থকদের আশা জাগাত।

Leave Your Comments