দাকোপের বানিশান্তা যৌনপল্লী নদীর তীব্র স্রোতে ভাঙনে চরম অস্তিত্ব সংকটে

স্বপন কুমার রায় খুলনা ব্যুরো প্রধানঃ

Date: শুক্রবার, অক্টোবর ০২, ২০২৬
news-banner
খুলনার দাকোপের বানিশান্তা যৌন পল্লীটিপশুর নদীর তীব্র স্রোত ও অব্যাহত ভাঙনে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে খুলনার দাকোপ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ও সরকারি নিবন্ধিত বাণীশান্তা যৌনপল্লী। মোংলা সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৪ সালে গড়ে ওঠা প্রায় সাত দশকের পুরোনো এই পল্লীটি এখন ধীরে ধীরে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে ইতি মধ্যে পশুর নদীর ভাঙনে পল্লীর বহু ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ ও চলাচলের রাস্তা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। বর্তমানে আরও বহু স্থাপনা ঝুঁকিতে রয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙনের তাণ্ডবে পল্লীর সীমানা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। নদীতীরের বেশ কিছু বসতঘর একাধিকবার নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় নতুন করে পেছনে ঘর তুলতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা। অনেক ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে বিশাল ফাটল দেখা দিয়েছে।স্থানীয় অধিবাসীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, একসময় এই পল্লীতে কয়েকশত নারী বসবাস করলেও অব্যাহত নদীভাঙন ও স্থানান্তরের কারণে বর্তমানে বাসিন্দার সংখ্যা কমে প্রায় ১৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। ভাঙনে শুধু ভিটেমাটিই নয়, তাদের জীবন-জীবিকা ও নিরাপদ থাকার জায়গাও চরম হুমকির মুখে পড়েছে।বাণীশান্তা পল্লীর ভারপ্রাপ্ত সভানেত্রী লাভলী বেগম বলেন, "নদীভাঙনের কারণে ঘর সরাতে সরাতে এখন আর পেছনে যাওয়ার জায়গা নেই। নদীতে ঘর ভেঙে গেলে কিছুটা পিছিয়ে আবার ঘর তুলতে হয়। কিন্তু পেছনে তো আর জমি নেই। এভাবে আর কতদিন টিকে থাকব জানি না।"তিনি আরও জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নদী থেকে উঠে আসা সরাসরি ঝড় বা জলচ্ছ্বাস এসে ঘরবাড়িতে আঘাত করে। চারপাশে লোনা পানি থাকায় পানীয় জলের তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং দূর থেকে নৌকায় করে পানি আনতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই মানবিক দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী কোনো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।যৌনপল্লীর বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—সমগ্র এলাকাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে তাদের চূড়ান্ত আশ্রয় কোথায় হবে? নির্দিষ্ট কোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনা না থাকায় দিন দিন অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সচেতন মহলের মতে, শুধু বাঁধ নির্মাণ বা ভাঙন ঠেকানোই শেষ কথা নয়; পল্লীর বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ আবাসন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও বিকল্প জীবিকার বিষয়টিও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি।এদিকে, বাণীশান্তা পল্লী এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের যাতায়াত নিয়েও স্থানীয় সামাজিক সচেতন মহলে গভীর উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর এই এলাকায় যাতায়াত করায় সামাজিক পরিবেশ ও কিশোরদের সুরক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জোরদার নজরদারি এবং কঠোর বয়স যাচাইয়ের আইনি ব্যবস্থা নিলে কিশোরদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে প্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হবে।সার্বিক বিষয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, "পল্লীর বাসিন্দাদের মানবিক সংকট ও নদীভাঙনের শোচনীয় অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিভাগ-২) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমান জানান, স্থানটি খুব শিগগিরই সরেজমিনে পরিদর্শন করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় বাঁধ সংস্কার বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।তবে স্থানীয় সচেতন অধিবাসীদের স্পষ্ট দাবি, তাত্ক্ষণিকভাবে নদীভাঙন ঠেকানোর উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসনের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে দক্ষিণ অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী পল্লীর অস্তিত্ব মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাবে।

Leave Your Comments