নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠিত পঞ্চগড়ের নারী উন্নয়ন ফোরাম এক সময় জেলার বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে তা কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকায় সংগঠনটির ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্নের পাশাপাশি হতাশাও বাড়ছে।
এক সময় জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত সভা, প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও সচেতনতামূলক নানা উদ্যোগের মাধ্যমে নারীদের মধ্যে অধিকার সচেতনতা ও আত্মনির্ভরতার বার্তা পৌঁছে দিত এই ফোরাম। তবে বর্তমানে সেই কার্যক্রমের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফোরামের নিয়মিত সভা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অনেকদিন ধরেই বন্ধ রয়েছে, ফলে নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্ল্যাটফর্মটি কার্যত অকার্যকর হয়ে আছে।
সদর উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সাবেক সভাপতি কামরুন নাহার শাহিন জানান, তিনি ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে নারীদের নিয়ে নিয়মিত সভা-সেমিনার আয়োজন করেছেন। সেখানে নারীর অধিকার, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং আত্মকর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা হতো। তার ভাষ্য, বর্তমানে সেই কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রামীণ নারীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, স্থানীয় সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নারী উন্নয়নে কাজ আরও গতিশীল করবে।
অন্যদিকে, তৃণমূল পর্যায়ে ফোরামটির অস্তিত্ব সম্পর্কেই অনেকেই অবগত নন। সদর উপজেলার ইসলাম বাগ এলাকার জোসনা খন্দকার বলেন, তার বয়স ৫৫ বছর হলেও তিনি এ ধরনের কোনো ফোরামের কথা শোনেননি এবং এর কাজ সম্পর্কেও কিছু জানেন না। একই উপজেলার কামাতপাড়া এলাকার হাসিনা বেগমও জানান, নারী উন্নয়ন ফোরামের নাম তিনি কোনোদিন শোনেননি। তবে নারীদের নিয়ে কাজ করে এমন কোনো ফোরাম থাকলে তা তাদের জন্য উপকারী হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
নারী উদ্যোক্তা খাদিজা খাতুন বলেন, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী উন্নয়ন ফোরামের নাম দেখেছেন, কিন্তু বাস্তবে পঞ্চগড়ে এর কোনো কার্যক্রম তার চোখে পড়েনি। একইভাবে নারী উদ্যোক্তা আতিকা উলফাত জানান, জেলা ও উপজেলায় এমন ফোরাম রয়েছে বলে শুনলেও এর কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না এবং বাস্তবায়ন কোথাও দেখেননি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাব দেখা যাচ্ছে। সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাহামিদা সুলতানা বলেন, তিনি এখানে নতুন হওয়ায় নারী উন্নয়ন ফোরাম সম্পর্কে তার তেমন জানা নেই। তবে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে পরবর্তীতে জানাতে পারবেন এবং নারীদের জন্য ইতিবাচক কোনো উদ্যোগ নেওয়া গেলে তা ভালো হবে বলে মত দেন।
সচেতন মহলের মতে, নারী উন্নয়ন ফোরামটি সক্রিয় থাকলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা এবং নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু বর্তমানে সংগঠনটি নামমাত্র থাকলেও বাস্তবে কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না।
পঞ্চগড় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরকার হায়দার বলেন, নারী উন্নয়ন ফোরামকে পুনরুজ্জীবিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই ফোরাম আবারও সক্রিয় হয়ে নারীদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবমিলিয়ে, এক সময়ের সক্রিয় এই সংগঠনটি এখন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় জেলার নারী উন্নয়ন কার্যক্রমে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।