গন্তব্যহীন জীবনের পথে শিল্পী আ. গনির নীরব লড়াই

সৈয়দপুর প্রতিনিধিঃ

Date: মঙ্গলবার, মে ২৬, ২০২৬
news-banner
অশীতিপর বৃদ্ধ আ. গনি। এক সময় তার হাতেই জন্ম নিত রঙের ভাষা। সাদা বোর্ডে ফুটে উঠত অক্ষরের সৌন্দর্য, গাড়ির গায়ে ছড়িয়ে পড়ত শিল্পের ছোঁয়া, ওষুধের প্যাকেটে থাকত তার নিখুঁত তুলির আঁচড়। শহরের মানুষ তাকে চিনত একজন আঁকিয়ে শিল্পী হিসেবে। অথচ আজ সেই মানুষটিই হারিয়ে ফেলেছেন স্মৃতির পথ, হারিয়ে ফেলেছেন নিজের ঠিকানাও। জীবন এখন তার কাটে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, সড়কের ধারে, পথের ধুলোয়।

‎জানা যায়, সৈয়দপুর শহরের মিস্তিরি পাড়া (কালী মন্দির) এলাকার বাসিন্দা আ. গনির বাবা আইয়ুব আলী, মা সুজা। স্ত্রী নাসরিন বর্তমানে জয়পুরহাটে শ্বশুরবাড়িতে আছেন। কিন্তু আ. গনির আজকের ঠিকানা যেন আর কোনো ঘর নয়— রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তা কিংবা শহরের কোনো ফুটপাত।

‎একসময় তিনি রঙ মিস্ত্রি ও আঁকিয়ে শিল্পী হিসেবে কাজ করতেন। সাইনবোর্ড লেখা, গাড়িতে আর্ট করা, ওষুধের প্যাকেটে নকশা— এসবই ছিল তার পরিচিতির অংশ। শহরের বাংলা হাই স্কুল মাঠ এলাকায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু প্রায় দুই দশক আগে কাজ ছেড়ে দেন। তারপর ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে তার স্বাভাবিক জীবন, স্মৃতিও হয়ে ওঠে ঝাপসা।

‎এখন দিনের পর দিন ময়লা পোশাক পরে শহরের পথে ঘুরে বেড়ান। শেষ কবে গোসল করেছেন, সেটিও মনে করতে পারেন না। পরিবার, আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশী— কেউ আর নিয়মিত খোঁজ নেন না।

‎স্থানীয়রা জানান, মানুষ ভালোবেসে তাকে খাবার ও কিছু টাকা দিত। কিন্তু আ. গনি সেই টাকা খরচ করতেন না। নিজের পকেটেই জমিয়ে রাখতেন বছরের পর বছর। প্রায় এক বছর আগে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক তাকে গোসল করানোর উদ্যোগ নেন। তখন তার পোশাকের পকেট থেকে উদ্ধার হয় ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। পরে প্রশাসনের মাধ্যমে সেই অর্থ সমাজসেবা অফিসে সংরক্ষণ করা হয়।

‎কিন্তু এরপর যেন আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন তিনি। অনেকে ধরে নেন— তার কাছে তো টাকা আছে। ফলে আগের মতো আর কেউ খাবার দেয় না, হাতে টাকা তুলে দেয় না। অথচ সেই অর্থ এখন তার হাতে নেই। তিনি কারও কাছে চেয়েও খান না। তাই অনেক সময় অর্ধাহারে, কখনও অনাহারে কেটে যায় দিন। এই প্রসঙ্গে আ. গনি বলেন, আমার টাকা তারা কেন নেবেন?

‎অন্যদিকে সৈয়দপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদ বলেন, “তার টাকা সংরক্ষিত রয়েছে। তবে টাকাটা কীভাবে তার হাতে দেওয়া যায়, সেটাও ভাবতে হচ্ছে। কারণ সরাসরি দিলে তিনি বিপদে পড়তে পারেন। ঈদের পর স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে বিষয়টির একটি সুরাহা করা হবে।”

‎একসময় শহরের দেয়াল, বোর্ড আর রঙে নিজের শিল্পের স্বাক্ষর রেখে যাওয়া মানুষটি আজ নিজেই যেন শহরের এক ভুলে যাওয়া ছবি।

‎রঙের মানুষটি এখন আর ছবি আঁকেন না— তিনি নিজেই যেন সময়ের ক্যানভাসে আঁকা এক নিঃসঙ্গ প্রতিকৃতি।

Leave Your Comments