রাজধানীর ডেমরা থানার সাইনবোর্ড এলাকায় ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামে মসজিদ’ দখল চেষ্টাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। মসজিদ কমিটির এক নেতা তথা স্থানীয় সাংবাদিককে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করার অভিযোগে ডেমরা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দখলচেষ্টা ও হামলার নেপথ্যে রয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের দুর্ধর্ষ ক্যাডার এবং জামায়াত-শিবিরের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতার এক অভিনব ‘যৌথ সিন্ডিকেট’। মামলা নম্বর-০৫ / তারিখ- ৪ জুলাই, ২০২৬।
*ঘটনার সূত্রপাত ও নৃশংস হামলা*
মামলার এজাহার এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুলাই ২০২৬ (বুধবার) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সাইনবোর্ড এলাকায় স্থানীয় জামায়াত নেতা ও সংসদ সদস্য কামাল আহমেদের একটি সমাবেশ চলছিল। অভিযোগ রয়েছে, সমাবেশ চলাকালীন জামায়াতের রোকন সন্ত্রাসী আহমেদ আল ইরফান নেতৃত্বে ৩০-৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ মসজিদটি দখলের উদ্দেশ্যে হানা দেয়।
এই সময়ে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের চিহ্নিত ক্যাডার এবং ডেমরা থানা মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি মো. সবুজ মিয়া ও যুবলীগ ক্যাডার রেজাউল হক রেজু অংশ নেয়। উল্লেখ্য, সবুজ ও রেজু উভয়ের বিরুদ্ধেই এলাকায় একাধিক হত্যা ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই সময় ‘দৈনিক বাংলার গৌরব’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লায়ন এম. আনোয়ার হোসেন রুমি মাগরিবের নামাজ শেষে মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মসজিদটি অবরুদ্ধ করার আগে সন্তাসী ক্যাডার আহমেদ আল ইরফান ও তার সহযোগীরা সাংবাদিক রুমির ওপর রড ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে আকস্মিক হামলা চালায়। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় ও শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করা হলে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
লুটপাটের অভিযোগে
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, হামলার পর গুরুতর আহত সাংবাদিক রুমির পকেট থেকে মসজিদের চাবিসহ নগদ ১৭ হাজার ৩০ টাকা এবং দুটি মূল্যবান স্মার্টফোন (ওপ্পো ও স্যামসাং) ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তার আত্ম-চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা সাধারণ মানুষের ওপরও চড়াও হয়। পরে এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
*ফুটপাত ও সিএনজি স্ট্যান্ডে ‘মাসিক বেতনে’ চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট*
অনুসন্ধানে সন্তাসী অস্ত্রধারী ক্যাডার আহমেদ আল ইরফানের বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজির এক অভিনব নেটওয়ার্কের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইতিপূর্বেও তিনি বেশ কয়েকবার এই মসজিদটি দখলের পাঁয়তারা করেছেন।
স্থানীয় ফুটপাত ও সিএনজি স্টেশন থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতে তিনি 'রানা' নামের এক ব্যক্তিকে মাসিক ২০ হাজার টাকা বেতনে নিয়োজিত করেছেন। রানা কর্তৃক সিএনজি চালকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় এবং সেই টাকা ‘বিকাশ’-এর মাধ্যমে লেনদেনের বেশ কিছু অডিও রেকর্ড ও তথ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
আইনি ক্ষমতার’ দাপট ও রাজনৈতিক প্রভাব
এলাকাবাসীর অভিযোগ
আহমেদ আল ইরফান নিজেকে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) হিসেবে পরিচয় দেন। এছাড়া তার স্ত্রী একজন সহকারী জজ—এই পারিবারিক ও আইনি পরিচয় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ডেমরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় সাধারণ মানুষকে নিয়মিত মামলার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল ও হয়রানি করে আসছেন।
বাদীপক্ষের দাবি,
আহমেদ আল ইরফান জামায়াত-শিবিরের প্রভাবশালী রোকন হওয়ায় বর্তমান ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল আহমেদের কাছে এর আগে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ায় এই চক্রটি দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
মসজিদ দখল, চাঁদাবাজি এবং সাংবাদিকের ওপর হামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডেমরা থানা নিষিদ্ধ আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি মো. সবুজ মিয়া এবং মূল অভিযুক্ত আহমেদ আল ইরফানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তবে তারা সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর এই বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে বা বক্তব্য দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান।
*থমথমে পরিস্থিতি: গ্রেফতারের দাবি*
এই ঘটনার পর থেকে ডেমরার সাইনবোর্ড এলাকায় চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পবিত্র ধর্মীয় উপাসনালয় দখলচেষ্টা এবং একজন সিনিয়র সাংবাদিকের ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে হামলার ঘটনায় স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লী ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী দাবী অনতিবিলম্বে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার এবং শিবিরের চাঁদাবাজ চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ডেমরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, "মসজিদ কেন্দ্রিক হামলার ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।"