একজন সাংবাদিকের প্রকৃত সাফল্য কেবল সংবাদের সংখ্যায় নয়, বরং তিনি কতটা গভীরভাবে সমাজ, মানুষ এবং ইতিহাসকে নিজের কলমে ধারণ করতে পেরেছেন তার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক সাংবাদিকতায় ঠিক এমনই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রথিতযশা সাংবাদিক পলাশ চৌধুরী। সম্প্রতি চ্যানেল আই অনলাইনে তাঁর প্রকাশিত শতাধিক অনুসন্ধানী ও তথ্যবহুল প্রতিবেদন বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমাজ, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার এক অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতায় যুক্ত পলাশ চৌধুরীর প্রতিবেদনের মূল কেন্দ্রবিন্দু—বৃহত্তর সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ অঞ্চল। বর্তমান সময়ের রাজধানীকেন্দ্রিক সাংবাদিকতার ভিড়ে তাঁর প্রতিটি মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং প্রমাণ করে, বাংলাদেশের প্রকৃত প্রাণশক্তি লুকিয়ে আছে প্রান্তিক জনপদের মানুষ ও তাদের লোকঐতিহ্যের মাঝে।
পলাশ চৌধুরীর সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিষয়বৈচিত্র্য। মণিপুরী, খাসিয়া, গারো, সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাওসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় ভাষা, জীবনসংগ্রাম এবং দোল, বিষু, ওয়ানগালা ও রাস উৎসবের মতো আয়োজনের গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য তিনি জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেছেন। তাঁর এই কাজকে নিছক রিপোর্টিং নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি 'চলমান ডিজিটাল আর্কাইভ' হিসেবে দেখছেন।
পরিবেশ সাংবাদিকতায়ও তিনি এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য, বাইক্কা বিলের অতিথি পাখি, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং শ্রীমঙ্গলের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলো জনসচেতনতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি মাধবপুর লেক, দার্জিলিং টিলা বা শতবর্ষী ডাকঘরের মতো দর্শনীয় স্থানগুলো নিয়ে লেখা তাঁর আকর্ষণীয় ফিচার শ্রীমঙ্গলকে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন অঞ্চল হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ব্র্যান্ডিং করতে সহায়তা করেছে।
সৃজনশীলতা ও মানবিকতার জয়গান:
ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী পলাশ চৌধুরী ১৯৮৯ সাল থেকে সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত। উদীচী, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ ও রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের মতো সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত এই গুণী মানুষটি তাঁর লেখনীতে সাহিত্যিক সুষমা ফুটিয়ে তুলেছেন। সমাজের নেতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি চা-বাগানের শিশুদের শিক্ষা, বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং মানবিক নানা নাগরিক উদ্যোগকে আলোয় এনে তিনি সমাজে ইতিবাচক অনুপ্রেরণা তৈরি করছেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রাজধানীর বাইরে থেকেও যে জাতীয় মানের কালজয়ী সাংবাদিকতা করা সম্ভব, পলাশ চৌধুরী তাঁর নিষ্ঠা ও অনুসন্ধিৎসা দিয়ে তা প্রমাণ করেছেন। সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি ও পর্যটন বিকাশে তাঁর এই সুদীর্ঘ ও নিরলস অবদান নিঃসন্দেহে জাতীয় স্বীকৃতির দাবিদার।