বিশ্বকাপের জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। গ্যালারিতে হাজারো দর্শক আর পর্দার সামনে কোটি বিশ্ববাসীর চোখ তখন মূল মঞ্চের দিকে। ঠিক তখনই এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হলো গোটা বিশ্ব, আর আনন্দে আত্মহারা হলো ১৮ কোটি বাংলাদেশি। বলিউড মেগাস্টার নোরা ফাতেহির সাথে স্টেজে যখন তালে তাল মেলাচ্ছিলেন এক যুবক, তখন পারফরম্যান্সের ফাঁকেই তিনি বারবার ক্যামেরার সামনে উঁচিয়ে ধরছিলেন নিজের হাত। সেখানে স্পষ্ট আঁকা ছিল বাংলার ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’, জাতীয় ফুল শাপলা আর প্রিয় লাল-সবুজ পতাকার নিখুঁত মোটিফ।
বিশ্বকাপের মতো মহামঞ্চে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে নিজের বাংলাদেশকে তুলে ধরা এই যুবকের নাম সঞ্জয় দেব। তিনি এখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডিজে এবং মিউজিক প্রডিউসার।
শেকড় ভোলেননি শ্রীমঙ্গলের সন্তান
সঞ্জয় দেবের জন্ম চায়ের রাজধানী খ্যাত সিলেটের শ্রীমঙ্গলে। তার বাবা সন্তোষ দেব এবং মা মিতা দেব। তিনি শ্রীমঙ্গলের সর্বশ্রদ্ধেয় ধীরেন্দ্রনাথ দেবের নাতি। শ্রীমঙ্গলে জন্ম হলেও সঞ্জয়ের বেড়ে ওঠা আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায়। প্রবাসী এবং মার্কিন নাগরিক হলেও নাড়ির টান যে তিনি বিন্দুমাত্র ভুলে যাননি, তার অনন্য প্রমাণ দিলেন বিশ্বকাপের এই উদ্বোধনী মঞ্চে।
আন্তর্জাতিক সঙ্গীত অঙ্গনে মিউজিক প্রডিউসার হিসেবে ইতিমধ্যেই বেশ সুপরিচিত নাম সঞ্জয়। নিজের সেই যোগ্যতা এবং বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার সুবাদেই এবার ফুটবল বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টে পারফর্ম করার ঐতিহাসিক সুযোগ পান তিনি।
প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ফুটবল বিশ্বকাপের অফিসিয়াল অ্যালবামে
সঞ্জয়ের এবারের সাফল্য কেবল উদ্বোধনী মঞ্চের পারফরম্যান্সেই সীমাবদ্ধ নয়, তিনি গড়েছেন এক অনন্য ইতিহাস। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের অফিসিয়াল অ্যালবামে নিজের গান অন্তর্ভুক্ত করার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। তার সুর করা ও প্রযোজিত গান 'সির সির' (Sir Sir) স্থান করে নিয়েছে ফিফার অফিসিয়াল অ্যালবামে। বিশ্বমঞ্চে ফুটবল উন্মাদনার অফিশিয়াল সাউন্ডট্র্যাক হিসেবে এখন বাজছে একজন বাংলাদেশির গান, যা দেশের সঙ্গীত ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক মহাকাব্যিক অর্জন।
পারফরম্যান্সে মুগ্ধতা, পোশাকে দেশপ্রেম
মঞ্চে নোরা ফাতেহির গর্জিয়াস নাচের সাথে সঞ্জয়ের অনবদ্য এনার্জি ও মিউজিক পুরো স্টেডিয়ামকে মাতিয়ে রেখেছিল। তবে প্রবাসে বড় হওয়া এই তরুণের দেশপ্রেম সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে দর্শকদের মনে। পারফর্ম করার সময় তিনি যেভাবে বারবার নিজের হাতের টাইগার ও লাল-সবুজ মোটিফ প্রদর্শন করছিলেন, তা ছিল দেখার মতো।
বিশ্বসঙ্গীতমঞ্চে বাংলা গানের ফেরিওয়ালা মহীতোষ তালুকদার তাপস তার এক ফেসবুক পোস্টে আবেগঘন কণ্ঠে লেখেন:
"সঞ্জয় ফিফা বিশ্বকাপের অনুষ্ঠানে গান গাইল। এর চাইতেও বড় কথা তার পোশাকে ছিল জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় ফুল শাপলা এবং প্রাণের লাল-সবুজ পতাকার মোটিফ। ছেলেটি গান গাইবার সময় লাল-সবুজ পতাকার দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছিলেন বিশ্ববাসীকে। ওর সবটা জুড়েই ছিল বাংলাদেশ, সবটা জুড়েই ছিল দেশপ্রেম। যদিও উনি মার্কিন নাগরিক, কিন্তু শেকড়ের কথা ভুলে যাননি। মনেপ্রাণে ধারণ করেন জন্মভূমিকে, প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশকে। তাকে ও তার মা-বাবাকে শ্রদ্ধা জানাই।"
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে বাংলাদেশকে এভাবে উপস্থাপন করে সঞ্জয় দেব প্রমাণ করলেন—শেকড়ের টান সীমানা মানে না। তার এই ঐতিহাসিক অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সঙ্গীত ও সংস্কৃতির এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করলো।